শর্করা মিটার (Glucometer) হলো একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি অপরিহার্য যন্ত্র। শর্করা মিটার ব্যবহার করে রোগীরা বাড়িতেই সহজে ও দ্রুত রক্তের শর্করার মাত্রা পরিমাপ করতে পারেন, যা রোগ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।
শর্করা মিটারের গঠন ও কাজ করার পদ্ধতি
শর্করামিটার সাধারণত তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত:
- পরীক্ষার স্ট্রিপ (Test Strip) – এটি শর্করা শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। রক্তের একটি ছোট বিন্দু এই স্ট্রিপে ফেলা হয়।
- ডিভাইস (Meter Device) – এটি মূল যন্ত্র, যা রক্তের শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে এবং ফলাফল প্রদর্শন করে।
- ল্যান্সেট (Lancet) বা সূঁচ – রক্ত সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত একটি ক্ষুদ্র সূঁচ, যা আঙুলে ছোট ছিদ্র করে রক্ত বের করতে সহায়তা করে।
শর্করা মিটার কাজ করে একটি এনজাইম-ভিত্তিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা শর্করার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে বৈদ্যুতিক সংকেত উৎপন্ন করে। ডিভাইসটি এই সংকেতের উপর ভিত্তি করে রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা নির্ণয় করে এবং স্ক্রিনে ফলাফল দেখায়।
শর্করা মিটারের প্রকারভেদ
বিভিন্ন প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে শর্করা মিটার কয়েকটি প্রধান ধরনের হতে পারে:
- স্ট্রিপ-ভিত্তিক শর্করা মিটার – প্রচলিত এবং বেশি ব্যবহৃত প্রযুক্তি, যেখানে পরীক্ষার স্ট্রিপ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। এটি কিনতেই আমরা বলি। যন্ত্রের দাম ৫০০ টাকার মধ্যে, ৫০ টা স্ট্রিপের দাম ৫০০ টাকা। দিনে তিনবার টেস্ট করলে মাসে খরচ ১৫০০ টাকা। Dr. Morepen, Accu-Check বাজারে চালু ব্র্যান্ড যাদের স্ট্রিপ সব জায়গায় পাবেন। ১০০ খানা ল্যানসেট ২০০ টাকা (আমাজন জাতীয় অনলাইন সাইট দেখুন)।
- নন-ইনভেসিভ (Non-invasive) শর্করা মিটার – রক্ত না নিয়ে, স্কিনের মাধ্যমে শর্করার মাত্রা নির্ণয় করে। এই দেশে সহজে পাওয়া যায় না। গুগলের রক্তের শর্করা মাপার কন্টাক্ট লেন্স নিয়ে রিসার্চ সবাই শুনেছেন।
- সিজিএমএস (Continuous Glucose Monitoring System – CGMS) – এটি দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং শরীরে সেন্সর স্থাপন করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রক্তের শর্করার পরিমাপ করে। যন্ত্রের দাম ৫০০০ টাকা, মাসে দুটো প্যাচ লাগে তার দাম ১০,০০০ টাকা।
শর্করা মিটার ব্যবহারের উপায়
শর্করা মিটার ব্যবহারের সাধারণ ধাপগুলো হলো:
- হাত ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।
- ল্যান্সেটের সাহায্যে আঙুলের ডগায় ছোট ছিদ্র করতে হবে।
- রক্তের বিন্দু পরীক্ষার স্ট্রিপে রাখতে হবে।
- স্ট্রিপটি শর্করা মিটারে প্রবেশ করাতে হবে।
- কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করার পর ডিভাইস স্ক্রিনে শর্করার মাত্রা দেখাবে।
শর্করা মিটার ব্যবহারের উপকারিতা
- সহজ ও দ্রুত রক্তের গ্লুকোজ পরিমাপ করা যায়।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণে সহায়ক।
- হাইপোগ্লাইসেমিয়া (Hypoglycemia) এবং হাইপারগ্লাইসেমিয়ার (Hyperglycemia) ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব।
- বাড়িতে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
শর্করা মিটার ব্যবহারে সতর্কতা
- পরীক্ষার স্ট্রিপ ব্যবহারের মেয়াদ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি মেনে চলা জরুরি।
- ডিভাইসটি নির্ভরযোগ্য কিনা তা নিশ্চিত করতে সময়ে সময়ে ক্যালিব্রেশন (Calibration) করা উচিত।
- ল্যান্সেট প্রতিবার ব্যবহার শেষে পরিবর্তন করা প্রয়োজন, যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো যায়।
- প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা মেনে চলা উচিত, কারণ ভুল ব্যবহার ভুল ফলাফল দিতে পারে।
উপসংহার
শর্করা মিটার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণ, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য। এটি সহজলভ্য, ব্যবহার উপযোগী এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সহায়ক। নিয়মিত রক্তের শর্করা পরিমাপের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার ডায়াবেটিসের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেন।