টাইপ ২ ডায়াবেটিস এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অনেক রোগীকে মুখে খাওয়ার ওষুধের পাশাপাশি বা একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করা হয়, এর বিভিন্ন প্রকারভেদ এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে এই প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ইনসুলিনের ভূমিকা
ইনসুলিন হল একটি হরমোন যা অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হয় এবং শরীরের কোষগুলিকে গ্লুকোজ গ্রহণে সহায়তা করে। টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমে যায় বা পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন উৎপাদিত হয় না, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।
কখন ইনসুলিন ব্যবহার করা হয়?
টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে ইনসুলিন ব্যবহার করা হতে পারে:
- মুখে খাওয়ার ওষুধ কার্যকর না হলে।
- রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অসুবিধা হলে।
- গুরুতর সংক্রমণ, অস্ত্রোপচার বা গর্ভাবস্থার সময়।
- দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিসের কারণে অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে না পারলে।
ইনসুলিনের ধরন
ইনসুলিনকে সাধারণত কাজের সময়কাল অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়:
১. দ্রুত-কার্যকরী ইনসুলিন (Rapid-acting Insulin)
- উদাহরণ: লিসপ্রো (Lispro), অ্যাসপার্ট (Aspart), গ্লুলিসিন (Glulisine)
- কাজ শুরু: ইনজেকশনের ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে।
- স্থায়িত্ব: প্রায় ৩-৫ ঘণ্টা।
- ব্যবহার: খাবারের আগে ইনজেকশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
২. স্বল্প-কার্যকরী ইনসুলিন (Short-acting Insulin)
- উদাহরণ: নিয়মিত ইনসুলিন (Regular insulin)
- কাজ শুরু: ৩০-৬০ মিনিটের মধ্যে।
- স্থায়িত্ব: ৬-৮ ঘণ্টা।
- ব্যবহার: খাবারের আগে নেওয়া হয়।
৩. মধ্যম-কার্যকরী ইনসুলিন (Intermediate-acting Insulin)
- উদাহরণ: এনপিএইচ (NPH – Neutral Protamine Hagedorn)
- কাজ শুরু: ২-৪ ঘণ্টার মধ্যে।
- স্থায়িত্ব: ১২-১৮ ঘণ্টা।
- ব্যবহার: সাধারণত দিনে এক বা দুইবার নেওয়া হয়।
৪. দীর্ঘমেয়াদী ইনসুলিন (Long-acting Insulin)
- উদাহরণ: গ্লার্জিন (Glargine), ডিটারমির (Detemir), ডিগলুডেক (Degludec)
- কাজ শুরু: ২-৬ ঘণ্টার মধ্যে।
- স্থায়িত্ব: ২৪ ঘণ্টা বা তার বেশি।
- ব্যবহার: দিনে একবার নেওয়া হয়, সাধারণত রাতে।
ইনসুলিন গ্রহণের পদ্ধতি
ইনসুলিন সাধারণত ইনজেকশনের মাধ্যমে নেওয়া হয়। ইনসুলিন গ্রহণের বিভিন্ন পদ্ধতি হলো:
- সিরিঞ্জ ও সুই: সাধারণত ইনসুলিন গ্রহণের প্রচলিত মাধ্যম।
- ইনসুলিন পেন: এটি সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ ইনসুলিন ইনজেকশন দিতে সাহায্য করে।
- ইনসুলিন পাম্প: এটি একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যা সারাদিন ইনসুলিন সরবরাহ করতে পারে।
ইনসুলিন গ্রহণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ইনসুলিন ব্যবহারের কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে:
- হাইপোগ্লাইসেমিয়া (Hypoglycemia): রক্তে শর্করার মাত্রা খুব কমে গেলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ঝাপসা দৃষ্টি, অথবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- ওজন বৃদ্ধি: ইনসুলিন ব্যবহারের ফলে কিছু রোগীর ওজন বাড়তে পারে।
- ইনজেকশন সাইটের সমস্যা: ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে ব্যথা, চুলকানি বা ফোলাভাব হতে পারে।
ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা ও ডাক্তারের পরামর্শ
- ইনসুলিন কখন এবং কতটুকু নিতে হবে, তা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুসরণ করা উচিত।
- নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত।
- খাবার ও ব্যায়ামের সাথে ইনসুলিন গ্রহণের সঠিক সময় সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।
- ইনসুলিন সংরক্ষণ করতে হবে সঠিক তাপমাত্রায় (ফ্রিজে রাখলে ২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ভালো থাকে)।
উপসংহার
টাইপ ২ ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার জন্য ইনসুলিন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। ইনসুলিনের সঠিক ব্যবহার, গ্রহণের সময়, এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন গ্রহণ করলে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা হ্রাস করা সম্ভব।