টাইপ ২ ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। রক্তে উচ্চমাত্রার শর্করা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকলে এটি ধমনীর ক্ষতি করে এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। নিচে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের প্রধান জটিলতাগুলি ব্যাখ্যা করা হলো।
হৃদরোগ ও রক্তনালীর সমস্যা
টাইপ ২ ডায়াবেটিস হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা রক্তনালীর দেয়ালকে শক্ত ও সংকুচিত করতে পারে, যা অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া) সৃষ্টি করে। এটি উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের কারণ হতে পারে।
স্নায়ুর ক্ষতি (নিউরোপ্যাথি)
বেশি সময় ধরে রক্তে উচ্চমাত্রার শর্করা থাকার কারণে স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে, যা ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি নামে পরিচিত। এটি সাধারণত পায়ের স্নায়ুকে প্রভাবিত করে, যার ফলে ঝিনঝিন অনুভূতি, ব্যথা, দুর্বলতা এবং সংবেদনশীলতার অভাব দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় এটি পায়ে ঘা সৃষ্টি করতে পারে।
কিডনির সমস্যা (নেফ্রোপ্যাথি)
ডায়াবেটিস কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে, যা ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তে শর্করা থাকার ফলে কিডনির ছোট রক্তনালীগুলোর ক্ষতি হতে পারে, যার ফলে কিডনি ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
চোখের সমস্যা (রেটিনোপ্যাথি ও অন্ধত্ব)
টাইপ ২ ডায়াবেটিস চোখের রক্তনালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির কারণ হতে পারে। এটি যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে ধীরে ধীরে অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। ডায়াবেটিস ক্যাটারাক্ট ও গ্লুকোমার ঝুঁকিও বাড়ায়।
পায়ের সমস্যা
ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের পায়ে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। নিউরোপ্যাথির কারণে পায়ে ব্যথা অনুভবের ক্ষমতা কমে যেতে পারে, ফলে ছোটখাটো কাটা বা ক্ষত বড় হয়ে যেতে পারে এবং চিকিৎসা না হলে সংক্রমণ গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পায়ের অংশ কেটে ফেলা (অ্যাম্পুটেশন) প্রয়োজন হতে পারে।
ত্বকের সমস্যা
ডায়াবেটিসের কারণে বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন ব্যাকটেরিয়াল ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, চুলকানি, ডায়াবেটিক বুল্লা (ফোস্কা) এবং একানথোসিস নিগরিকান্স (ত্বক কালো হয়ে যাওয়া)।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
ডায়াবেটিস মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে। এটি উদ্বেগ (anxiety) এবং হতাশা (depression) বৃদ্ধির কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে ইনসুলিন বা ওষুধের ওপর নির্ভরশীল।
আলঝেইমার এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমে যাওয়া
গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলঝেইমার রোগ বা অন্যান্য স্মৃতিভ্রংশজনিত সমস্যার ঝুঁকি বেশি থাকে। উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা মস্তিষ্কের কোষের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যৌনস্বাস্থ্য সমস্যা
ডায়াবেটিস স্নায়ুর ক্ষতি করে এবং রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে ইরেক্টাইল ডিসফাংশন (ED) এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে যৌন ইচ্ছা হ্রাস ও যোনি শুষ্কতার কারণ হতে পারে।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়
ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা এড়ানোর জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ:
- নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা
- নিয়মিত ব্যায়াম করা
- ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
- ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা
- চোখ, কিডনি ও পায়ের যত্ন নেওয়া
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের জটিলতা প্রতিরোধযোগ্য যদি রোগী জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয় এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করে। সঠিক জীবনধারা অনুসরণ করলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং সুস্থ জীবনযাপন করা যায়।
আরও পড়ুন: