গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলো এক ধরনের ডায়াবেটিস যা গর্ভধারণের সময় প্রথমবারের মতো ধরা পড়ে। এটি সাধারণত গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে দেখা যায় এবং গর্ভাবস্থার পরে চলে যেতে পারে। তবে এটি মা এবং শিশুর জন্য বিভিন্ন ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
লক্ষণ
অনেক সময় গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা অনুভব করা
- ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
- অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা
- মুখ শুকিয়ে যাওয়া
কারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস তখন ঘটে যখন গর্ভাবস্থার হরমোনগুলো ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাহত করে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। কিছু বিষয় গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেমন:
- অতিরিক্ত ওজন
- পূর্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়া
- পারিবারিক ইতিহাসে ডায়াবেটিস থাকা
- উচ্চ রক্তচাপ থাকা
- পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)
পরীক্ষা ও নির্ণয়
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য সাধারণত গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (GTT) করা হয়। এই পরীক্ষায় গর্ভবতী নারীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজ পান করানো হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। যদি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, তবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়।
প্রভাব এবং জটিলতা
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করলে এটি মা এবং শিশুর জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। কিছু সম্ভাব্য জটিলতা হলো:
- শিশুর অতিরিক্ত ওজন হওয়া (Macrosomia)
- অকাল প্রসবের ঝুঁকি
- শিশুর রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া (Hypoglycemia)
- ভবিষ্যতে মা ও শিশুর টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করা (কম শর্করা এবং উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া)
- নিয়মিত ব্যায়াম করা
- নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা
- ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধ গ্রহণ করা (প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)
প্রসবের পরে যত্ন
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সাধারণত প্রসবের পরে সেরে যায়, তবে এটি মা এবং শিশুর ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রসবের পরে কিছু সময় পরপর রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা জরুরি। যারা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, তাদের ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস একটি সাময়িক সমস্যা হলেও এটি মা ও শিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। সঠিক সময়ে নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যত্ন নেওয়া গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।